অবশেষে পায়রা বন্দরে পণ্য খালাশ কার্যক্রম শুরু
পটুয়াখালী বার্তা, পটুয়াখালী
তারিখ: ২০১৬-০৯-০৩ | সময়: ০৯:২০:৫১
মেজবাহউদ্দিন মাননু ॥ অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে পায়রা সমুদ্র বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হলো। ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে ১২ হাজার ৫০২ মেট্রিক টন ক্লিংকারবাহী মাদার ভ্যাসেল (এমভি) এফ এস বীচ থেকে লাইটার জাহাজ এমভি চান সরদারে ক্লিংকার লোড করার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে এ ক্ষণটি দেশের ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় হয়ে থাকল। ঘটল দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দরের অগ্রযাত্রা। রামনাবাদের অভ্যন্তরীণ ইনার চ্যানেল চারিপাড়া পয়েন্টে এ পণ্য খালাশ কার্যক্রম শুরু করা হয়। মালয়েশিয়া থেকে মাদার ভ্যাসেলটি মদিনা গ্রুপের এ পরিমাণ ক্লিংকার নিয়ে ১৪ আগস্ট বহির্নোঙ্গরে এসে পৌছে মাদার ভ্যাসেল এফ এস বীচ। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পণ্য এতোদিন খালাশ করা যায়নি। লাইটার জাহাজ এমভি চান সরদার ১১ শ’ মেট্রিক টন ক্লিংকার বোঝাই করে আগামি ৮ সেপ্টেম্বর মদিনা গ্রুপের আরও তিনটি জাহাজ হাজী সেলিম-২, হাজী সেলিম-১ ও বেগম সালেহা বাকি পণ্য নিয়ে ঢাকার মেঘনাঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হবে বলে জানা গেছে। পণ্য খালাশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় মিলাদ ও দোয়া মোনাজাতের মধ্য দিয়ে। এসময় বন্দর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন সাইদুর রহমান, মদিনা গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোলায়মান সেলিম, মদিনা গ্রুপের ডিজিএম মাহাবুব আলম, ডিজিএম কামরুল হাসান, উপদেষ্টা গোলাম হোসেন, কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মেজবাহউদ্দিন মাননুসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। মাদার ভ্যাসেল এফ এস বীচ এর ক্যাপ্টেন ডোয়ান মাই ফু জানান, সাগর মোহনা থেকে এ চ্যানেলের চারিপাড়া পয়েন্টে পণ্যবাহী জাহাজ নিয়ে আসতে নাব্যতা সমস্যায় পড়তে হয়নি, বরং স্বাচ্ছন্দবোধ করেছেন। লাইটার জাহাজ এমভি চান সরদারের মাস্টার নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রথম জাহাজে এ বন্দর থেকে পণ্য বহন করতে পেরে আনন্দিত, আপ্লুত।’ তিনি আরও জানান, দুর্যোগকালেও এ বন্দরের রামনাবাদ চ্যানেলে পণ্য খালাশ করতে কোন সমস্যা হবে না। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চীফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম হাবিব-উল-আলম জানান, বহির্নোঙ্গর থেকে পণ্যবাহী মাদার ভ্যাসেল রামনাবাদ চ্যানেলে নিয়ে আসতে কোন ধরনের সমস্যা হয়নি। ভুগতে হয়নি কোন শঙ্কায়। কোন ধরনের ড্রেজিং ছাড়াই নির্বিঘেœ পণ্যবাহী জাহাজ খালাশ করতে পেরে সবাই আনন্দিত। বন্দরসূত্রে জানা গেছে, আজ রবিবার প্রথম পণ্যবাহী জাহাজ ফরচুন বার্ড পণ্য খালাশের জন্য রামনাবাদ চ্যানেলে এসে পৌঁছবে। বন্দরসূত্রে আরও জানা গেছে, আরও পণ্যবাহী কয়েকটি মাদার ভ্যাসেল রামনাবাদ চ্যানেলে এসে পৌঁছবে। মোট কথা পায়রা বন্দরের রামনাবাদ চ্যানেলে এখনও পণ্যখালাশের কার্যক্রম চলছে জোরেশোরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে ১৩ আগস্ট দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রার পণ্য খালাশ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ২০১৩ সালের ১৯ নবেম্বর। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ওই দিনটি হয়ে আছে ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ হিসাবে। যা ছিল মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। এখন এর বাস্তব প্রতিফলন দেখছেন তারা। ফলে অজানা, অচেনা এ জনপদ এখন হয়ে আছে কর্মমুখর। ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলবে অন্তত টানা ১৫ বছর। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডে মানুষ সারা বছর থাকবে সম্পৃক্ত। ২০১৮ সালে পুরোদমে চালু হবে এ বন্দরটির কার্যক্রম। টিয়াখালীতে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পায়রা সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩ পাশ হয়। এ আইনের আওতায় রামনাবাদ পাড়ের মধ্যবর্তী টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়াতে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার প্রতিশ্রুতি অনুসারে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এ জনপদকে ঘিরে। বেছে নেয়া হয় রামনাবাদ চ্যানলেকে। বহুদফা দেশি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদল সমীক্ষা চালায়। বাস্তবতার নিরিখেই নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, নৌ-সচিব, বন্দর চেয়ারম্যানসহ বহু প্রচেষ্টায় সফলতায় পৌঁছে পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মান কার্যক্রম। ঝড়-ঝঞ্চা বিক্ষুব্ধ এ অঞ্চলের মানুষকে শুধুমাত্র কৃষি এবং মাছ ধরার পেশাকেই বেছে নিতে হয়েছিল জীবিকার অন্বেষণে। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এ এলাকার মানুষের কাছে এ পেশায় দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। ধুঁকে ধুঁকে চলা পেশার চলন শক্তিতে এখন যেন গতির সঞ্চার ঘটেছে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাকৃতিক বৈরি পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিপর্যয় উপলব্ধি করতে পেরে পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় পরিবর্তনের ছোঁয়া এনে দিয়েছেন। শিল্পভিত্তিক অঞ্চল ছাড়াও পর্যটন শিল্পকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রুপ নিতেই তার এ প্রচেষ্টা। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটল অপারেশনাল কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে।
Comment Disabled



