হাঁটু পরিমাণ পানিতে ভাসছে পটুয়াখালী শহর
পটুয়াখালী বার্তা, পটুয়াখালী
তারিখ: ২০১৬-০৮-২১ | সময়: ০৯:১৮:৩৭
স্টাফ রিপোর্টার ॥ পূর্ণিমার জোঁ ও সাগরে নি¤œাচাপ সৃষ্টি হওয়ায় সাগর ও নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে অনেক এলাকার বাড়ি ঘরে ডুকে পড়েছে পানি। কেউ ঘর ছেড়ে চলে গেছেন, কেউবা আবার ঘর-বাড়ি ছাড়ছেন, আবার বাড়ি ছেড়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন উচু সড়কে। গত কয়েকদিনে দফায় দফায় জোয়ারের পানির তোড়ে ভাঙা বেড়িবাঁধের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
নি¤œচাপের প্রভাবে পটুয়াখালীতে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। ২১ আগস্ট রবিবার সকাল ৬টা থেকে ভারী বর্ষণের কারণে পটুয়াখালী শহরের অধিকাংশ সড়ক ও এলাকায় এক থেকে দেড় ফুট, কোথাও দুই ফুট পানিতে ডুবে যায়। রেকর্ড পরিমাণ ভারী বৃষ্টির ফলে জেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। তলিয়ে সকল ফসলের ক্ষেত। স্থল নি¤œচাপের কারণে সমূদ্রবন্দর পায়রায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরে ২ নম্বর নৌ হুশিয়ারী সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ৬৫ ফুটের নিচের ছোট সব নৌযান চলাচল।
পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক মো. রাহাত হোসেন জানান, রবিবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘন্টায় ২০৬.০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত কয়েক বছরের এক দিনে মাত্র ৯ ঘন্টায় এই পরিমাণ বৃষ্টি পাতের কোন রেকর্ড নেই বলেও জানান আবহাওয়া অফিস। এদিকে মেঘমালার প্রভাবে ও ভারি বর্ষণের ফলে নদী সমূহে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কলেজ রোড, বনানী, মুসলিম পাড়া সড়ক, পৌরসভা সড়ক, কাজী পাড়া সড়ক, পিটিআই সড়ক, শিমুলবাগ, পুরানবাজার জনতা ব্যাংক সড়ক, পুরান বাজার, সরকারি মহিলা কলেজ থেকে জুবিলী স্কুল সড়ক, শহরের সদর রোড, কলাতলা বাজারসহ অধিকাংশ সড়ক এবং এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এ বৃষ্টির পানিতে অধিকাংশ বাসাবাড়ি, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যায়।
পটুয়াখালী নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ রুটের সব ধরণের নৌ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এবং মাছ ধরতে যাওয়া সাগরের সব ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
বাউফল উপজেলার চন্দ্রদীপ ইউনিয়নের চর দিয়ারাকচুয়া, রায়সাহেব ও মিয়াজান এলাকায় এলজিইডির অর্থায়নে বেড়িবাঁধ নির্মান হলেও সিডর, আইলাসহ বিভিন্ন সময় প্রলঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে ওই বেরিবাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট বিধস্ত হয়েছে। তবে এসব বেরিবাঁধ সংস্কার না করায় বর্তমানে ওই বেরিবাঁধও এলাকাবাসীর কোন উপকারে আসছে না। ফলে পুরো চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন বর্তমানে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত। ইতিমধ্যে জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে ওই ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পুকুর।
এ ব্যাপারে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. এনামুল হক বলেন, ‘বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের মানুষ প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জোয়ার আর যখন তখন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করে। প্রতিবছর চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে এই জোয়ারের পানিতে জনদূর্ভোগের পাশাপাশি পানিতে ডুবে মারা যায় শিশুরা, চরবাসি আক্রান্ত হয় নানা ধরণের পানিবাহিত রোগে। অবস্থার উন্নতির জন্য সরকারের উচিত দ্রুত এ এলাকায় বেরিবাঁধ নির্মন করা।’
ওই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহামুদ জামান বলেন, ‘নদী বেষ্টিত চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের পাশাপাশি, চর মমিনপুর, চরবাসুদেবপাশা এবং চর পাকডাল এলাকার মানুষ জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। ওইসব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চাষাবাদ এবং গবাদিপশু রক্ষার্থে দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের ব্যাপারে উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
এদিকে দশমিনা উপজেলার চর হাদি, চর বোরহান ও চর শাহাজালাল, গলাচিপা উপজেলার চরকাজল, চরবিশ্বাস এলাকার নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত মানুষরা জোয়ারের প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ওই বাঁধ বিধস্ত হয়ে ভেসে গেছে প্রায় ৫০টি মাছের ঘের। চরমোন্তাজ ইউনিয়নের মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির করা কাশেম খার ডোস ঘেরটি প্লাবিত হয়ে প্রায় আট লাখ টাকার পোনা মাছ ভেসে গেছে। ওই সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল ইসলাম শহীদ বলেন, ‘বাঁধ ভাঙনে ঘের মালিকদের প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এখন ঘের আর নদী সমান। সামগ্রিক ভাবে এ ক্ষতির পরিমান বছর শেষে ১০ থেকে ১২কোটি টাকা হবে।’
ভাঙা বাঁধের সংস্কারের বিষয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত বাঁধ সংস্কার করা হবে।’
অপরদিকে জোয়ারের ¯্রােতের তোড়ে দুমকি উপজেলার পাংগাশিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাংগাশিয়া গ্রামের ওয়াপদা বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে অন্তত: ৫/৬গ্রাম তলিয়ে গেছে। এতে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
শনি ও রবিবারের টানা বৃষ্টি আর পায়রা লোহালিয়া নদীতে পূর্ণিমার জো’র প্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়া জোয়ারের ¯্রােতের তোড়ে পটুয়াখালীর লোহালিয়া, লাউকাঠী, ইটবাড়িয়া, ছোট বিঘাই, মির্জাগঞ্জের সদর, কাঠালতলী, দুমকি উপজেলার পাংগাশিয়া, আংগারিয়া, লেবুখালী ও মুরাদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নি¤œাঞ্চল তলিয়ে গেছে। পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের জসিম উদ্দিন জানান, টানা বৃষ্টির সাথে পায়ার নদীর জোয়ারের তীব্র ¯্রােতের চাপে ৫নং ওয়ার্ডের অন্তত: ৫০/৬০ফুট ওয়াপদা বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে নদীতে চলে গেছে। ওই ভাঙ্গন দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে অন্তত: ৫/৬টি গ্রামের বাড়ি, ঘর, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। পানিবদ্ধি হয়ে পড়েছে ওই এলাকার শতাধিক পরিবার। পশ্চিম আংগারিয়ার বাসিন্দা সুলতান মোল্লা (৫৫) জানান, ওয়াপদার ভাঙ্গন মেরামত না করায় প্রতিমৌসুমে পায়রা নদীর জোয়ারের পানিতে পশ্চিম আংগারিয়ার শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। এদিকে জোয়ারের পানিতে গ্যাংওয়ে তলিয়ে যাওয়ায় লেবুখালী ঘাটে যানবাহন ওঠানামা বিঘিœত হচ্ছে। বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটার সড়ক যোগাযোগ ঊহৃ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পাঙ্গাশিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলমগীর সিকদার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পানিবন্দি এলাকায় আমনের চাষাবাদ নিয়ে কৃষকরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, পানি কমে গেলে স্থানীয় ভাবে পানি আটকানের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
Comment Disabled



