স্পষ্টভাষী জননেতা কাশেম উকিলের আজ ২৩তম মৃত্যু বার্ষিকী

সিনিয়র সাব এডিটর
পটুয়াখালী বার্তা, পটুয়াখালী

তারিখ: ২০১৭-১১-০৯ | সময়: ০৮:১৬:১৮

সাব্বির আহমেদ: ধ্যানে-জ্ঞানে, মনে-প্রাণে জনকল্যাণে নিবেদিত প্রাণ একজন মানুষ ছিলেন এডভোকেট মোঃ আবুল কাশেম। সাধারণ মানুষের কাছে যিনি কাশেম উকিল নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। দেশ ভাগের কিছুকাল পুর্বে ১৯৩৮ সালে জন্ম নেয়া আবুল কাশেম সারাটা জীবন কাটিয়েছেন রাজনীতি নিয়ে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের দেখা মাত্র গুলির হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে জেল খেটেছেন মৃত্যুদণ্ডের আশংকা নিয়ে। সরকারী চাকুরী ছেড়ে তিনি আইনজীবী হয়েছিলেন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পথ সুগম করার জন্য। নিজের এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হবার জন্য ছেড়েছেন ঢাকা শহরের উন্নত সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠিত জীবন।


পটুয়াখালী শহর সংলগ্ন কালিকাপুর ইউনিয়নের হেতালিয়া গ্রামে আলহাজ্ব মোঃ মোন্তাজ উদ্দিন হাওলাদার এবং আরবজান বিবির ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন এডভোকেট মোঃ আবুল কাশেম। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের ছোট। নিজ গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে শুরু হয় তাঁর শিক্ষা জীবন। তৃতীয় শ্রেণি থেকে জুবিলী স্কুলে। লেখাপড়া করার জন্য শৈশবে পটুয়াখালী শহরে মেঝ ভাইয়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন মোঃ আবুল কাশেম। মাঝে মধ্যে স্কুলে এসেছেন নিজ গ্রাম হেতালিয়া থেকে ৬/৭ কিলোমিটার পথ হেঁটে। হেতালিয়া থেকে স্কুলে আসার পথে পার হতে হতো শহরের দক্ষিণ পাশের নদীটি। কখনো কখনো নদী পারের জন্য খেয়া থাকত না। তখন এক হাতে বই-পত্র, পড়নের কাপড় নিয়ে আরেক হাতে সাঁতরে নদী পার হয়ে স্কুলে এসেছেন ক্লাস করতে। নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায়। তাঁর সহপাঠী, বন্ধু মরহুম বিচারপতি বদরুল হক বাচ্চু এক স্মৃতি কথনে জানিয়েছিলেন, সম্ভবত কাশেমই ছিল প্রথম ব্যক্তি যিনি পটুয়াখালী থেকে স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছিল। দুই বন্ধু জুটি বেঁধে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন স্কুলের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায়।

কাশেম উকিলের রাজনীতির আনুষ্ঠানিক শুরু হয়েছিল দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। ১৯৫৫ সালে পটুয়াখালী মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর আজীবন রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বন্ধু বদরুল হক বাচ্চু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আরেক সহপাঠী, বন্ধু নুর হোসেন হিরা। পটুয়াখালীর ছাত্র ইউনিয়নের গোড়াপত্তন করে থেমে যাননি আবুল কাশেম। ছাত্র ইউনিয়নের ভিত্তি স্থাপন করে পরবর্তী সময়ে নিজে ঢাকায়, বরিশালে পড়াশোনা করার পাশাপাশি পটুয়াখালী ছাত্র ইউনিয়নের পেছনে লেগে থেকেছেন দীর্ঘদিন। কে সভাপতি হবেন, সে সধারণ সম্পাদক, কে পটুয়াখালী কলেজের ভিপি পদে আর কে জিএস পদে নির্বাচন করবেন; কিভাবে কলেজ সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নকে জিতিয়ে আনা যায় - এসব বিষয়ে যুক্ত থেকেছেন ছাত্র জীবন শেষ করে কর্ম জীবনেরও অনেককাল ধরে। শহরের মুসলিম পাড়ার তাঁর মেঝ ভাইয়ের বাসা এবং পরবর্তীতে নবাব পাড়ার নিজের বাসা ছিল পটুয়াখালী ছাত্র ইউনিয়নের দীর্ঘ কালীন, অন্যতম আড্ডা স্থল।

‘৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে রাজনীতিতে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে শুধু নবাব, জমিদার, রাজা, বাহাদুরেরা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ফলে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে পরেছিল বৃটিশদের সৃষ্টি করা সেই রাজনৈতিক কাঠামো। দুশো বছরের ইংরেজ শাসনামলের শোষণ থেকে মুক্তি পেয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা তখন রাজনীতিতে অংশ নিয়ে নিজের দেশ নিজে পরিচালনা করার তাগিদে আগ্রহী হয়ে যোগ দিয়েছিল রাজনীতিতে। কাশেম উকিল কোন ব্যাতিক্রম নন। তিনি এদেরই একজন। নিজের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ঘোচানোর সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম যে রাজনীতি তা তিনি স্কুল জীবনেই বুঝে ফেলেছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছিলেন জুবিলী স্কুলের ইংরেজী শিক্ষক, দেলোয়ার স্যার। তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রী। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে ছাত্রদের তিনি পড়তে দিতেন সাম্যবাদী বই-পুস্তক। দেশভাগ পরবর্তী সেই নতুন সময়ে দেলোয়ার স্যারের নিবিড় পরিচর্যায় কাশেম উকিল হয়ে উঠেন একজন প্রকৃত মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রী, এবং সমাজতন্ত্রী।

১৯৫৬ সালে স্কুল জীবন শেষ করে মোঃ আবুল কাশেম উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। থাকতেন আরমানিটোলার এক ছাত্রাবাসে। কলেজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে। অচিরেই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সংস্পর্শে আসেন; সংগঠনের কাজে ঘুরে বেড়ান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালে। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সে নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে তাঁকে বরিশাল পাঠায় ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য। বিএ দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হয়ে তিন মাসের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বিএম কলেছের ছাত্র-ছাত্রীদের মন জয় করে নির্বাচিত হন বিপুল ভোটে। ৬২ সালের সে নির্বাচনে তাঁর হয়ে প্রচারণা করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের নামকরা আইনজীবী শেখ আফজাল। বনেদি ঘরের রাশভারী স্বভাবের শেখ আফজাল সে নির্বাচনের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, কাশেমের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য আমি ইংরেজীতে বক্তৃতা দিতাম, কাশেম এবং আমার বক্তৃতা শোনার জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা দল বেঁধে ছুটে আসত, আমাদের প্রচারণা সভার মত এত ছাত্র সমাগম আর কোন সভায় হতনা।

আইয়ুব খান ৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের কিছু দিনের মধ্যে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, যেটি শরিফ শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিতি পায়। শরিফ কমিশনের প্রতিবেদনে ধর্মান্ধ, ধনবাদী, রক্ষণশীল, সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাসংকোচন নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল। আইয়ুব সরকার এই রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করে এবং তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। শুরু থেকেই আইয়ুব খানের শিক্ষা নীতির বিরোধিতা করে ছাত্র সমাজ। এ নিয়ে ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় প্রতিবাদ হয়। আন্দোলনে কিছুটা ছন্দপতন হয়ে আবার তা বেগবান হয় আগস্ট মাসে। সে সময়ে ঢাকায় দুজন ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হলে পরদিন বিএম কলেজ প্রাঙ্গণে গায়েবানা জানাযার আয়োজন করে ছাত্র ইউনিয়ন।

গায়েবানা জানাযার বর্ণনা শুনেছি পটুয়াখালী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড আজিজের কাছে। সকাল দশটায় জানাযার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। সময়মত যথাস্থানে উপস্থিত হয়েছে মাত্র ৮/১০ জন ছাত্র। তাদের মধ্যে ভিপি আবুল কাশেম এবং অনুজ কমরেড আজিজ ছিলেন। ৮/১০ জনেই জানাযার নামাজ শুরু করার উপক্রম করলে আইয়ুব শাসনের ভয়ে ভীত বিএম কলেজের অধ্যক্ষ জানাযা স্থলে ছুটে আসেন তা বন্ধ করতে। তিনি ছাত্রদের এই কর্মসূচী পরিহার করতে অনুরোধ করেন এবং তক্ষনি জানাযাস্থল ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েকজন শিক্ষক। ছাত্ররা জানাযার নামাজ পড়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলে শিক্ষক এবং ছাত্রদের মধ্যে কথাবার্তা দীর্ঘায়িত হয়। ছাত্র-শিক্ষকের জটলা দেখে কলেজ ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা বেড়িয়ে আসতে শুরু করে। এতে জমায়েত বড় হতে থাকে। ধীরে ধীরে সংখ্যাটা দুশোতে পৌঁছায়। ছাত্র সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তির জোর বাড়তে থাকে কলেজ সংসদের ভিপি এবং অন্যান্য ছাত্র নেতাদের। তারা যথাস্থানে জানাযার নামাজ আদায় করে শিক্ষানীতি বাতিলের দাবীতে মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে বরিশাল শহরে।

শুধু ছাত্ররাই নন, মিছিলে যোগ দিতে থাকেন সাধারণ মানুষ। শরিফ কমিশনের শিক্ষানীতির অগ্রহণযোগ্যতা শুধু ছাত্রদেরই নয়, প্রতিবাদী করেছিল সকলস্তরের মানুষকে। মিছিল যখন সোনালী সিনেমার কাছে আসে তখন মিছিলে মানুষের সংখ্যা দুই হাজার। বড় হতে হতে মিছিল যখন বিবি পুকুর পৌঁছায় তখন মিছিলে মানুষ ২০ হাজার। এই বিশাল মিছিল নিয়ে কিছু একটা করার কথা ভাবছিলেন ছাত্র নেতৃবৃন্দ। হঠাৎ করেই ভিপি কাশেম বললেন, টাউন হলের নামটা বদলে দেয়া যাক। টাউন হলের নাম মহাত্মা অশ্বিনী কুমারের নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। ভিপি কাশেম নিজেই উঁচুতে উঠে টাউন হলের সাইন বোর্ড নামিয়ে ফেলেন এবং সেখানে অশ্বিনী কুমার টাউন হল নামটা লিখে দিয়ে আসেন। এই কাজের পুরস্কার হিসেবে হুলিয়া নিয়ে কয়েক দিন পালিয়ে থেকে ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। জেল খাটেন বরিশালে। জেলখানায় আসে লিখিতভাবে রাজনীতি না করার শর্তে মুক্তির প্রতিশ্রুতি। বণ্ড সই না করলে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি আছে। তা জানতে পেরে মেঝ ভাই ইসহাক হাওলাদার জেল গেটে অনুরোধ কছিলেন বণ্ড সই করার জন্য। বড় ভাই এর অনুরোধ উপেক্ষা করে; মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি নিয়ে বিরত থেকেছেন শর্তযুক্ত মুক্তির লিপিতে স্বাক্ষর করা থেকে।

কমরেড আজিজ বলেছেন, এ ঘটনায় ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন শুধু বরিশালে নয় বেগবান হয়ে ওঠে ঢাকাসহ সারা দেশে। অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত গণ-বিরোধী শিক্ষানীতি বাতিলের দাবী ছড়িয়ে পড়ে দেশের আনাচে-কানাচে। শহরে, নগরে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ জোরালো হয়। আইয়ুব সরকার শরিফ কমিশন প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনই ছিল পাকিস্তানী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মত ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রতিবাদ। এতে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব জোরালো হয়; জেগে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদ; শুরু হয় বাংলাদেশ গঠন প্রক্রিয়া। শিক্ষা আন্দোলনে সৃষ্ট বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন ঘটে ‘৬৬ সালে ঘোষিত বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় এবং ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে।

বিএম কলেজের পাঠ চুকিয়ে তিনি নিজ শহরে টাউন স্কুল এবং মিতালী সংসদ প্রতিষ্ঠার কাজে অংশ নেন। এরপর নিজের ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠা করেন ডিবুয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয়। দুই স্কুলেই তিনি প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দ্বায়িত্ব পালন করেন। ‘৬৩ সালে মোঃ আবুল কাশেম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আমতলী নিবাসী আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন তালুকদার এবং বেগম ফজিলাতুন্নেসার জ্যেষ্ঠ কণ্যা বেগম সামসুননাহারের সঙ্গে। তারপর ঢাকায় কর্ম জীবন। ঢাকায় তিনি একদিকে ওয়াপদা’র (Water and Power Development Board) চাকরী, আরেক দিকে আইন পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর জীবন এবং রাজনৈতিক সঙ্গিনী বেগম সামসুননাহার তখন ঢাকার সেন্ট্রাল ওমেন্স কলেজের ছাত্রী। চাকুরী এবং পড়াশোনার সঙ্গে চলছিল তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।

‘৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক ভাবে গ্রহণ করার আগেই এর পক্ষে অবস্থান নেয় ছাত্র ইউনিয়ন এবং ন্যাপের প্রগতিশীল অংশ। ছয় দফা যে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ তা বাম ধারার রাজনীতিবিদেরা বুঝে নিয়েছিল তৎক্ষণাৎ। ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ এবং গাঢাকা দেয়া কমিউনিস্টরা এর প্রচারণা করে। সে কাজে অংশ নিয়েছেন মোঃ আবুল কাশেম স্বস্ত্রীক। সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন ‘৬৯ এর গণআন্দোলনে। ‘৭০ এর নির্বাচনে ঢাকার ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চেয়েছেন কুঁড়ের ঘর প্রতীকে। দুজনেই উপস্থিত থেকেছেন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে স্ত্রীকে শ্বশুরালয়ে রেখে এসে ওয়াপদা’র কাজে যোগ দেন। এপ্রিল মাসেই বুঝতে পারেন নিজ দ্বায়িত্বের কথা। ঢাকা ছেড়ে চলে যান পটুয়াখালী। মুক্তিযুদ্ধকালে ন্যাপ (মোজাফফর) এবং ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গীদের সঙ্গে পালিয়ে বেড়ান বিভিন্ন জায়গায়; যোগাযোগ রাখেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে; অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে।

আইন পাশ করে এডভোকেট মোঃ আবুল কাশেম ঢাকায় প্রাকটিস শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে পটুয়াখালী বারে যোগ দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন পটুয়াখালীতে। একই সঙ্গে যোগ দেন পটুয়াখালী জেলা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ, মোজাফফর)। পরবর্তীতে ন্যাপ (মোজাফফর) ভেঙ্গে গেলে তিনি ন্যাপ (হারুন) এ যোগ দেন। এ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার প্রক্রিয়া শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং পর পর দুই দফা সামরিক শাসনামল দেখে তিনি ৪০ এর দশক থেকে পূর্ব বাংলায় সামন্তবাদীদের প্রতিরোধের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য বাম ধারার যে প্রগতিশীল রাজনীতি শুরু হয়েছিল সে রাজনীতির যবনিকাপাত দেখতে পান।

তিনি সমসময় মনে করতেন রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভাগ্যন্নয়ন। বাম রাজনীতির মাধ্যমে তা আর তাঁর বাকী জীবনে সম্ভব হবে না বলে বুঝতে পেরেছিলেন ৮০’র দশকে। তদুপরি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর ন্যাপ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান তাঁর চিন্তাকে জোরালো করে। পরবর্তী সময়ে বাম নেতা সাইফুদ্দিন মানিকের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহণও তিনি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। ৪০ এর দশক থেকে পূর্ব বাংলায় শুরু হওয়া সাম্যবাদী রাজনীতির সময়োপযোগিতা হারিয়ে যাচ্ছে দেখে সারা জীবন বিরোধী শিবিরে থেকে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা কাশেম উকিল ‘৮৬ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশ নিয়ে জনকল্যাণ করার উদ্দ্যেশ্যে। আমৃত্যু তিনি জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতির পদে বহাল ছিলেন।

শেষ জীবনে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে তিনি ভূমিকা রেখেছেন জনকল্যাণে। বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রেক্ষাপটে সারা দেশে যে রায়ট শুরু হয়েছিল তার প্রভাব পড়তে দেননি পটুয়াখালীতে। সকল দলমতের মানুষ সঙ্গে নিয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে বাড়াবাড়ি না করার বার্তা দিয়েছেন উগ্রবাদীদের; নিরাপদ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জান-মাল। তার ঐকান্তিক চেষ্টায় স্থাপিত হয়েছে পটুয়াখালী চক্ষু হাসপাতাল। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জনপ্রতিনিধি হবার জন্য মাত্র দুবার নির্বাচন করেছেন। ‘৮৫ সালের উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে হেরে গেলেও বিজয়ী হন ‘৮৭ সালের নির্বাচনে। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে যেসব কাজ তিনি করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্রামে গ্রামে গভীর নলকূপ স্থাপন করে ঘরে ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেয়া। আরেকটি হচ্ছে পটুয়াখালী উপজেলার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুলগুলোর সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করে অত্র অঞ্চলে বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা বিস্তার সহজ করে দেয়া।

কাশেম উকিলের কর্ম জীবনের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সামাজিক সংগঠন সমূহের সঙ্গে যুক্ত থাকা। ‘৯৫ সালের ৯ নভেম্বর মৃত্যু বরণের দিন তিনি ৩৬টি সংগঠনের সভাপতি ছিলেন; সদস্য বা অন্যান্য পদে ছিলেন আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্লাব, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, মসজিদ, মাদ্রাসা থেকে শুরু করে সমবায় ব্যাংক, ল্যান্ড মর্গেজ ব্যাংক, আইনজীবী সমিতি, সবই ছিল। পটুয়াখালী আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দিনরাত মানুষের সেবায় নিয়োজিত থেকে করেছেন জনকল্যাণ। মধ্যরাতে তাঁকে ঘুম থেকে তুলে কারো কোন বিপদের খবর দেয়া হলে তৎক্ষণাৎ ছুটে গেছেন অকুস্থলে। তার মৃত্যুর পরে বহু মানুষ এই লেখককে বলেছেন তারা কবে, কিভাবে কাশেম উকিলের দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। তার মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরে একদিন দেখেছি রাস্তায় দাঁড়িয়ে সীমানা দেয়ালের উপর থেকে উকি দিয়ে এক লোক আমাদের ঘরের মধ্যে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। সামনে এগিয়ে যেতেই তিনি বললেন, আপনার বাবার ছবিটা দেখার চেষ্টা করছিলাম। ছবিটা ভাল করে দেখানোর জন্য আমি সেই লোকের হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যাই। লোকটি দীর্ঘক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে কেঁদেছেন। যারা দীর্ঘ দিন পটুয়াখালীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বড় বড় পদে কাজ করেছেন এমন মানুষেরা হরহামেশা বলেছেন, কাশেম উকিল ছিল বাঘের বাচ্চা। তাঁর মত এত সাহসী, স্পষ্টভাষী এবং ন্যায়পরায়ণ নেতা পটুয়াখালীর রাজনীতিতে আর আসেন নাই।


২০ অক্টোবর ২০১৭
কলাবাগান, ঢাকা।





Comment Disabled

Comments