“খান মোশারফ” যে জলে আগুন জ্বলে

সিনিয়র সাব এডিটর
পটুয়াখালী বার্তা, পটুয়াখালী

তারিখ: ২০১৭-১১-০৩ | সময়: ২৩:২২:৫৯

তানভীর আহমেদ: এই তো কিছুদিন আগের কথা, বাংলাদেশ সচিবালয়ের মধ্যে খান মোশারফ ভাইয়ের সাথে হেটে যাচ্ছি হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন তারাস্বরে মোশারফ - মোশারফ বলে চিৎকার করে ডাকছে, পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গত পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ঘিরে একটা কথা তো পটুয়াখালীতে প্রায় কিংবদন্তির মত মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফেরে, জনৈক সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আশির্বাদ আনতে। গণভবনে জননেত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে ছালাম করে তিনি বললেন, নেত্রী আমি এবার পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সেক্রেটারী পদে প্রার্থী হতে চাই, আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন “কেন খান মোশারফ কি মারা গিয়েছে”। হ্যাঁ গত ১লা নভেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আজন্ম আওয়ামী লীগের জন্য নিবেদিত প্রাণ মানুষ, প্রিয় নেতা খান মোশারফ হোসেন। খান মোশারফ জীবনে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কিছুই করেন নি। সংসার চালানোর খরচ কোথা থেকে আসবে সে চিন্তা না করে চিন্তা করেছেন দল কিভাবে চলবে, বিপদগ্রস্থ কোন নেতা-কর্মীর সমস্যার সমাধান কিভাবে আসবে। সংসারটা সেই দুঃসময়ে মূলত আগলে রেখেছিলেন তার প্রয়াত সহধর্মিনী মহিয়সী হিনু ভাবি। সে মানুষটির আকুন্ঠ সমর্থন না পেলে রগকাটা মোশারফ থেকে খান মোশারফ হয়তো তাঁর হয়ে ওঠা হতো না।
খান মোশারফ তার কৈশর থেকেই বঙ্গবন্ধুর প্রেমে পড়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় পাশ করার আগেই তিনি একজন কর্মী হিসেবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যোগ দেয়। ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েই তিনি ছাত্র গনঅভূত্থানে পটুয়াখালীতে নেতৃত্ব দেন এবং সে বছরই তিনি মহাকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর আস্তে আস্তে দেশের পরিস্থিতি উত্তাল হতে থাকে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে চুড়ান্ত স্বাধীনতার দিকে এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে থাকেন। আসে সেই চুড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষন। ৭মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনে স্বাধীনতার ঘোষনার পর খান মোশারফ সহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তরুণ খান মোশারফ সবসময়েই আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন সামনের কাতারে, তিনি পালিয়ে ভারত চলে যান মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। ফিরে এসে পটুয়াখালীর সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার (বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার) নেতৃত্বে সামনে থেকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। তার যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সাহসিকতার বর্ণনা সহযোদ্ধাদের মুখে মুখে এখনও রূপকথার মত ছড়িয়ে আছে। অবশেষে দেশ স্বাধীন হলে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খান মোশারফ হোসেন। বিএ ক্লাসে পড়পশুনার পাশাপাশি চলতে থাকে তার প্রথম ভালোবাসা রাজনীতি। ১৯৭৩ সালে তার ছাত্র নেতৃত্বের সফলতার পুরস্কার হিসেবে তিনি পটুয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় থেকে যুদ্ধ বিধস্থ এ জেলার পূর্ণগঠনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আত্ম নিয়োগ করেন। এরপর এলো সেই ভয়াল কালো রাত, জাতির পিতা খুন হলেন ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট, পাল্টে গেল দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি কোনভাবেই দেশে টিকে থাকতে না পেরে পালিয়ে গেলেন আবার ভারতে। সেখানেই একে একে সংগঠিত হলো তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত জননেতা আব্দুর রাজ্জাক এবং আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ্। গঠিত হলো “মুজিব বাহিনী”। ঠিক হলো বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে দেশে প্রবেশ করে দেশের সামরিক সরকারকে বিপর্যস্ত করার জন্য চোরাগোপ্তা হামলা করে সরকার কে অস্থিতিশীল করবে। সে অনুযায়ী আবুল হাসনাত আব্দল্লাহ্ র নেতৃত্বে কুমিল্লা সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করলেন। বিভিন্ন জায়গায় সফলভাবে হামলা চালালেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকার কমলাপুর রেল ষ্টেশনের কাছে হামলার প্রস্তুতি নেয়ার সময় সঙ্গিদের সহ সেনাবাহিনীর হাতে স্টেনগান সহ ধরা পরেন। তথ্য বের করার জন্য সেনাবাহিনী তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। দীর্ঘ আড়াই বছর কারাভোগের পর ১৯৭৯ সালে জেল থেকে মুক্তি পান এবং এমএজি ওসমানির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী প্রচারনায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৮০ সালে পটুয়াখালী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮১ সালে ডঃ কামাল হোসেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৮২ সালে  স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে কাজ করেন। ১৯৮৬ সালে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পান এবং বঙ্গবন্ধু কণ্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম করেন। ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে পটুয়াখালী জেলায় আন্দলোন কে বেগবান করেন। ৯০ গণ অভুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী জেলার আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৩ সালে সম্মেলনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নিরাপেক্ষ নির্বচনের দাবীতে গণ আন্দোলনে অগ্রণি ভুমিকা পালন করেন। ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৪ এ জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ২০০৬ এ নিরাপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলন সহ বিভিন্ন আন্দলোন সংগ্রামে নিবেদিত প্রাান এ আওয়ামী লীগ নেতা সাহসী ভুমিকা রাখেন এ জন্য তার বারবার কারাভোগ সহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, কিন্তু কখনও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হন নি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে সরকারে এলে খান মোশারফ এর সারা জীবনের দলের প্রতি আনুগত্যর পুরোস্কার হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকে পটুয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০০৪ সালে তিনি তৃতীয় মেয়াদে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব পান। পাঁচ বছর সফলভাবে জেলা পরিষদের প্রশাসকের দ্বয়িত্ব পালনের পরে ২০১৬ সালে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেব অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ পদে দায়িত্বরত ছিলেন।
এত নির্লোভ, নিরহংকারী রাজনীতির অন্তপ্রাণ মানুষ আজকের সময়ে বড় কম। তার সাথে কোথায় যেন একটা রসায়ন ছিল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়ার। এ দুজন মানুষ মিলেমিশে নেতৃত্ব দিয়েছেন গত ২৬টি বছর পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগকে। তাদের হাতে দীর্ঘদিন ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়েছে পটুয়াখালীর সাধারণ মানুষের, কোনদিন কারও ক্ষতি করেছেন এমন অভিযোগ শুনিনি। খান মোশারফ সারা জীবন শুধু রাজনীতি করে গেছেন, এ রাজনীতি করে যে তিনি লাভবান হবেন সে চিন্তা কোনদিন করেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে দুহাত উজার করে দিয়ে গেছেন আর খান মোশারফ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নিজের সবটুকো নিংড়ে দিয়ে গেছেন তার প্রানের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে। রাজনীতি অন্তঃপ্রাণ এমন নেতা সমসাময়িক সময়ে আর দেখা যায় নি। জয় হোক রাজনীতির, জয় হোক মানবতার, ভালো থাকুন প্রিয় খান মোশারফ হোসেন, সৃষ্টিকর্তা আপনার আত্মার উপর শান্তি বর্ষিত করুক।

লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, পটুয়াখালী জেলা শাখা।
kinnorytanvir@gmail.com





Comment Disabled

Comments